জাহাঙ্গীর শামস, সিবিএন ডেস্ক;
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে আকাশে উড়ে সাগর দেখার জনপ্রিয় বিনোদন প্যারাসেইলিং যেন ক্রমেই মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে। প্যারাসেইলিংয়ের সময় নিরাপত্তা হারনেস থেকে ছিটকে পড়ে এবার প্রাণ হারিয়েছেন খুলনা থেকে আসা শৌভিক রায় নামে এক পর্যটক।
শনিবার (১ আগস্ট) দুপুর ১টার দিকে কক্সবাজারের কলাতলীর দরিয়ানগর এলাকায় ফরিদ’স প্যারাসেইলিং পয়েন্টে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহত শৌভিক রায় খুলনা জেলার বাসিন্দা। তিনি নয় সদস্যের একটি পর্যটক দলের সঙ্গে কক্সবাজারে বেড়াতে এসেছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্যারাসেইলিং চলাকালে হঠাৎ নিরাপত্তা হারনেস থেকে ছিটকে সমুদ্রে পড়ে গুরুতর আহত হন শৌভিক। পরে সি স্পোর্টস প্যারাসেইলিং কর্তৃপক্ষ তাকে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার পর নিহতের স্বজন ও সফরসঙ্গীদের আহাজারিতে হাসপাতাল এলাকা ভারী হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে স্থানীয়দের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে কক্সবাজারে প্যারাসেইলিং পরিচালিত হলেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর কোনো নজরদারি নেই। একের পর এক দুর্ঘটনার পরও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এর আগে একাধিক দুর্ঘটনার পর প্রশাসন প্যারাসেইলিং সাময়িকভাবে বন্ধের নির্দেশ দিলেও অল্প সময়ের মধ্যেই রহস্যজনকভাবে আবারও অনিরাপদ এ কার্যক্রম চালু হয়ে যায়।
স্থানীয়রা জানান, গত বছরের ৩০ আগস্ট দরিয়ানগর সৈকতে প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে এক পর্যটক ঝাউগাছের ডগায় আটকে দীর্ঘ সময় ঝুলে ছিলেন। পরে তাকে উদ্ধার করা হলেও পরদিন জেলা প্রশাসন সাময়িকভাবে সব ধরনের প্যারাসেইলিং কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়।
এর আগে ২০২৫ সালের ২০ মে দরিয়ানগর সৈকতে প্যারাসেইলিংয়ের সময় এক পর্যটক দম্পতি সমুদ্রে ছিটকে পড়ে আহত হন। সে সময় প্রশাসনের দাবি ছিল, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় নিয়ম ভেঙে একসঙ্গে দুজনকে নিয়ে উড্ডয়ন করানো হয়েছিল। ওই ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সরঞ্জাম জব্দ করে কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
একই বছরের আরেক ঘটনায় এক নারী পর্যটক প্যারাসেইলিং চলাকালে সমুদ্রে পড়ে আহত হন। তখনও জেলা প্রশাসন নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। প্রশাসনের ভাষ্য ছিল, নিরাপত্তা নির্দেশনা উপেক্ষা করে প্যারাসেইলিং পরিচালনা করা হচ্ছিল। তবে কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করেই কীভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় কার্যক্রম চালু করেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগ রয়েছে, কক্সবাজারের দরিয়ানগর ও হিমছড়ি এলাকায় পরিচালিত অধিকাংশ প্যারাসেইলিং প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা সরঞ্জামের মান, যান্ত্রিক সক্ষমতা এবং প্রশিক্ষিত জনবল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। নিম্নমানের লাইফ জ্যাকেট, পুরোনো দড়ি, যান্ত্রিক ত্রুটি এবং পর্যাপ্ত উদ্ধারব্যবস্থার অভাবে পর্যটকদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ছে। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ের চেয়ে কম সময় রাইড দিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও দীর্ঘদিনের।
কক্সবাজার ট্যুরিস্ট ক্লাবের সভাপতি মো. রেজাউল করিম বলেন, নিরাপত্তার মান যাচাই না হওয়া পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ প্যারাসেইলিং কার্যক্রম বন্ধ রাখা উচিত। পর্যটন শিল্পের বিকাশের স্বার্থে বিশ্বমানের নিরাপত্তাব্যবস্থা, কার্যকর মনিটরিং, প্রশিক্ষিত অপারেটর এবং নিয়মিত কারিগরি পরীক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
কক্সবাজার হোটেল-মোটেল ও গেস্টহাউস অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী সদস্য করিম উল্লাহ কলিম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগে থাকা প্যারাসেইলিং কার্যক্রমে আবারও প্রাণহানির ঘটনা উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এ ধরনের দুর্ঘটনা ভবিষ্যতেও ঘটতে পারে।
দুর্ঘটনায় মৃত্যু এবং বিভিন্ন অভিযোগের পরও কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে জানতে সি স্পোর্টস প্যারাসেইলিং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক এম. এ. মান্নান বলেন, “আমরা আগে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছিলাম। কিন্তু তারা লুকোচুরি করে আবার চালু করেছে। বিষয়টি জানতে পেরে গত সপ্তাহে আমাদের পর্যটন ম্যাজিস্ট্রেট ঘটনাস্থলে গিয়ে কঠোর নির্দেশনা দিয়ে এসেছিলেন। এর মধ্যেই এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। আমরা দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি মনিটরিং আরও জোরদার করছি।”
